ঢাকা, ||

ফিরে আসার গল্প


সাহিত্য

প্রকাশিত: ৪:৩০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৯, ২০১৯

প্রে‌মের গল্প: ফিরে আসার গল্প।
মাথার উপর বাবা নামক বটবৃক্ষ‌ের ছায়া নেই ব‌লে অনিক‌কে আজ ছাত্রজীব‌নেই জীবনযু‌দ্ধে নে‌মে পড়‌তে হ‌য়ে‌ছে। একটা কোম্পা‌নির বিক্রয় প্র‌তি‌নি‌ধির চাক‌রি কর‌ছে। পাশাপা‌শি ঢি‌লেঢালাভা‌বে লেখাপড়া চল‌ছে। জীব‌নে আ‌ভিজাত্য না থাক‌লেও সু‌খের কম‌তি নেই; স্নেহ, ভা‌লোবাসার ঘাট‌তি নেই। মা‌য়ের স্নেহ, বো‌নের ভা‌লোবাসার পাশাপা‌শি এক স্বপ্নমানবীর প্রে‌মের উষ্ণস্প‌র্শে রাঙা‌নো তার জীবন। মে‌য়েটার নাম নীত‌ু। তার সা‌থে অ‌নি‌কের বহু‌দি‌নের সম্পর্ক। অ‌নি‌কের ছু‌টির দ‌িনে দুজ‌নে বাদাম খে‌তে খে‌তে পা‌র্কে ঘু‌রে বেড়ায়; মাঝে মা‌ঝে ছোট ছোট ছে‌লে‌দের সা‌থে মজা ক‌রে ক্রি‌কেট খে‌লে। কখ‌নো বা দুজ‌নে খোলা মা‌ঠে ঘা‌সের বু‌কে ব‌সে আকাশ দে‌খে আর স্ব‌প্নের ফানুস উড়ায়। এভা‌বে বেশ দারুণ সময় কে‌টে যা‌চ্ছিল। কিন্তু বিপ‌ত্তি বাধে নীতুর এইচ.এস.সি পাসের পর। তার বাবা-মা বি‌য়ে ঠিক ক‌রে ফে‌লে। নীতু লেখাপড়া ক‌রে বড় হতে চায় ব‌লে বি‌য়ে‌তে রাজি হয় না। বাবা-মা চাপ দি‌লে সে বাধ্য হ‌য়ে বাড়ি ছাড়ে। তার বিপ‌দের দ‌িনে অনিক পা‌শে এ‌সে দাঁড়ায়। নীতু‌কে একটা ছাত্রীনিবা‌সে উ‌ঠি‌য়ে দেয়। অ‌নিকই সব খরচ চা‌লিয়ে দেয়। অ‌নিক‌কে এই বাড়‌তি চাপ সামলা‌তে টাকা ধার কর‌তে হ‌য়ে‌ছে। নীতু টিউশনি কর‌তে চাই‌লে অ‌নিক বাধা দেয়। নীতু‌কে মন দি‌য়ে ভ‌র্তি পরীক্ষার জন্য পড়‌তে ব‌লে। এমন‌কি আরও কিছু টাকা ধার ক‌রে নীতু‌কে একটা কো‌চিং‌ সেন্টা‌রে ভ‌র্তি ক‌রি‌য়ে দেয়। নীতু পড়ায় জোর দেয়। ফ‌লে বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ে চান্স পায়।ক্যাম্পা‌সের র‌ঙিন জীবনে প্র‌বেশ করে নীতু ধী‌রে ধী‌রে বদ‌লে যে‌তে থা‌কে। সাগর না‌মের একটা ছে‌লের সা‌থে তার চমৎকার সম্পর্ক গ‌ড়ে ও‌ঠে। পাশাপা‌শি এক ধনী ব্যক্ত‌ির সা‌থেও তার প্রে‌মের সম্পর্ক গ‌ড়ে ও‌ঠে। নীতু‌কে সে সংসার বাঁধার স্বপ্ন দেখায়। নীতুর প‌রিবর্তনটা অ‌নিক বুঝতে পারছিল। তা‌কে সব সময় ফো‌নে পায় না। পে‌লেও আ‌গের ম‌তো মন খু‌লে কথা ব‌লে না। দেখা কর‌তে চাই‌লে নীতু রা‌জি হয় না। অ‌নিক এক‌দিন এসব বিষয় নি‌য়ে অ‌ভিমান প্রকাশ কর‌লে নীতু ব‌লে, আ‌রে বাবা! আমার কী লেখাপড়া নাই? শুধু তোমার সা‌থে কথা বলব আর ঘু‌রে বেড়াব!
নীতুর এমন আচর‌ণে অ‌নিক হতাশ হ‌য়ে প‌ড়ে। কী কর‌বে ভে‌বে পায় না। এর মধ্যে নীতু তার মোবাইল নম্বর পাল্টা‌নোয় অ‌নি‌ক নীতুর কো‌নো সন্ধান পায় না। ফ‌লে অ‌নিক এক‌দিন নীতুর খোঁজে তার ক্যাম্পা‌সে যায়। নীত‌ু অ‌নিক‌কে দে‌খে অ‌নেক অপমান করে। শে‌ষে রুক্ষ কথা ব‌লে দেয়, আর কখ‌নো ক্যাম্পা‌সে আসবে না। তোমার আর আমার অবস্থানটা তোমার বোঝার কথা!
নীতুর এমন নিষ্ঠুর আচর‌ণে অনিক কথা বলার ভাষাই হা‌রি‌য়ে ফে‌লে। অ‌নেক ক‌ষ্টে শুধু একটা কথাই ব‌লে, নীতু তু‌মি এভা‌বে বদলে যা‌বে কো‌নো‌দিন ভাবি‌নি, কীভা‌বে তু‌মি সবকিছ‌ু ভুলে যে‌তে পার‌লে?
নীতু ব‌লল, আ‌মি কিছুই ভু‌লি নি। তু‌মি আমার জন্য কিছু টাকা খরচ ক‌রেছ, সেটা শিগ‌গিরই পে‌য়ে যা‌বে!
অ‌নিক দুঃখভারাক্রান্ত হৃদ‌য়ে ক্যাম্পাস থে‌কে বের‌িয়ে এ‌সে সেই খোলা মা‌ঠে গি‌য়ে বসল, যে মা‌ঠের সবুজ ঘা‌সে ব‌সে নীতুকে নি‌য়ে স্ব‌প্নের ফানুস উড়াত। আজ একাকী সেই ঘাসের বু‌কে শু‌য়ে আকা‌শের দি‌কে তা‌কি‌য়ে রইল। এক‌েকটা স্মৃতি ম‌নে পড়‌ছে, আর বুক ভে‌ঙে কান্না আস‌ছে। ত‌বে নি‌জে‌কেই নি‌জে‌ সান্ত্বনা দিল, নীতু উপ‌রে উ‌ঠে গে‌ছে, কেন তার সা‌থে প‌ড়ে থাক‌বে! যার যাওয়ার সে গে‌ছে। তা‌কে ভে‌ঙে পড়‌লে চল‌বে না। উ‌ঠে দাঁড়া‌তে হ‌বে।
নীতুর দিনগু‌লি আন‌ন্দে কে‌টে যা‌চ্ছে। সাগর তা‌কে ছাড়া কিছুই বুঝ‌ে না। সব সময় পা‌শে রা‌খে। দা‌মি দা‌মি অলংকার উপহার দেয়।
অন্য‌দি‌কে সেই ধনী ব্য‌ক্তির সা‌থেও নীতুর প্রেমটা দারুণ চল‌ছে। সে নীতু‌কে বি‌য়ে ক‌রে ঘ‌রে তুল‌তে চা‌চ্ছে, কিন্তু নীতু এখনই বি‌য়ে কর‌তে চায় না।
অ‌নিক ক‌ঠোর পরিশ্রম ক‌রে ঢাকা জেলার এ‌রিয়া ম্যানেজার হি‌সে‌বে প্র‌মোশন পায়। প‌রের বছর তা‌দের কোম্পা‌নি লোকসান কর‌লেও ঢাকায় তা‌দের বি‌ক্রি বাড়ে। ফলে অন‌‌িক আবারও প্র‌মোশন পে‌য়ে কোম্পা‌নির প্রধান মা‌র্কে‌টিং ম্যা‌নেজার হয়। এবার তার বাড়ি, গাড়ি সব হয়। তবু সব সময় নীতুর শূন্যতা অনুভব ক‌রে।
এক‌দিন নীতু জান‌তে পা‌রে, সেই ধনী লোকটা বিবা‌হিত; যে নীতুকে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দে‌খি‌য়ে‌ছে। নীতু তার সা‌থে দেখা ক‌রে কথা ব‌লে। লোকটা উদ্ভট যুক্তি দেখায়, আমার সংসার আ‌ছে তা ঠিক কিন্তু আ‌মি তোমা‌কেই  ভা‌লোবা‌সি। তোমা‌কে বি‌য়ে ক‌রে আলাদা বাড়‌িতে উঠাব।
নীত‌ু লোকটা‌কে বকাঝকা ক‌রে সম্প‌র্কের অবসান ঘটায়। পর‌দিন সে সাগ‌রের সা‌থে দেখা ক‌রে তার ভাবনাটা জান‌তে চায়। তার কথা হ‌লো, একসা‌থে চল‌ছি, মজা কর‌ছি, বি‌য়ে করে সংসার বাঁধার তো প্রশ্ন আ‌সে না!
অথচ নীতু ধ‌রেই নি‌য়ে‌ছিল, সাগর তা‌কে সারাজীবন কা‌ছে পে‌তে চায়।
এভা‌বে  নীতুর স্ব‌প্নের জগৎটা হঠাৎ ভে‌ঙে প‌ড়ে। আজ অ‌নেকদিন পর নীতুর ম‌নে পড়ে অ‌নি‌কের কথা। একমাত্র অ‌নিকই তাকে স‌ত্যিকার অ‌র্থে ভা‌লোবাসত। অ‌নিক‌কে কষ্ট দেওয়ার জন্য নীতু ভীষণ অনুতপ্ত হয়।
পরদিন নীত‌ু অনিক‌দের বাসায় যায়। কিন্ত‌ু সেখা‌নে এখন অনিক থাকে না। নীত‌ু হলে ফি‌রে এসে কাঁদ‌তে থাকে। তার রুম‌মেট সান্ত্বনা দি‌য়ে ব‌লে, মনটা‌কে শক্ত কর। আজ টিএসসিতে একটা কোম্পানির একজন বড় কর্মকর্তা প্লাস মো‌টি‌ভেশনাল স্পিসার আস‌বে। চল, তার কথা শু‌নে আ‌সি।
নীতু রা‌জি না হ‌লেও বান্ধবী অ‌নেকটা টেনেট‌ুনে নি‌য়ে যায়।
তারা পৌঁছা‌তে না পৌঁছা‌তেই  বক্তা ম‌ঞ্চে উ‌ঠে গে‌ছেন। তারা তখ‌নো সিট খ‌ুঁজছে।
বক্তা কথা ব‌লে চল‌ছেন, আমার একজন প্রে‌মিকা ছিল। দারুণ একটা মে‌য়ে…
কণ্ঠটা নীতুর প‌রি‌চিত মনে হয়। মঞ্চে তাকাতেই তার বুক হীম হ‌য়ে যায়। এ যে অ‌নিক!
নীতু বিস্ময়াভিভূত হ‌য়ে তাক‌িয়ে থাক‌ে আর অ‌নিক ব‌লে চলে, এক‌দিন সে উপরে উ‌ঠে যায়, তারপর বদ‌লে যায়। আমি ভীষণ কষ্ট পাই কিন্তু ভেঙে যাই না। বরং বড় হওয়ার স্পৃহা বে‌ড়ে যায়। তখন ঘ‌ুরে দাঁ‌ড়ি‌য়ে‌ছিলাম ব‌লে আজ আপনা‌দের স্বপ্ন প্রসার‌িত করতে আসতে পে‌রে‌ছি…
নীত‌ু শুন‌ছে আর অঝর ধারায় নীরবে কাঁদ‌ছে।
অ‌নিকের বক্তব্য শেষ হ‌লে সবাই উঠে যে‌তে থা‌কে। অ‌নিক চ‌লে যাওয়ার জন্য তৈ‌রি হয়। ঠিক তখন নীত‌ু দৌ‌ড়ে গি‌য়ে ডাক দেয়, অ‌নিক!
নীতু‌র কণ্ঠ শু‌নে অ‌নিক চম‌কে ওঠে। তাক‌িয়ে দে‌খে নীতু তার দি‌কে আস‌ছে।
নীতু দৌ‌ড়ে এসে অ‌নিকের পা‌য়ের উপর পড়ে কাঁদ‌তে কাঁদ‌তে ব‌লে, অ‌নিক, আমা‌কে তুমি ক্ষমা ক‌রে দাও।
অ‌নিক নীতুকে টে‌নে তু‌লে ব‌লে, আ‌রে নীতু তু‌মি! পাগলা‌মি ক‌রছ কেন!
 তোমাকে আ‌মি অনেক কষ্ট দি‌য়ে‌ছি, আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও।
কষ্ট‌ দি‌য়ে তুমি আমাকে বদ‌লে দি‌য়েছ। এজন্য তোমা‌কে অ‌নেক ধন্যবাদ।
এভাবে বল‌লে আ‌মি ম‌রেও শা‌ন্তি পাব না।
তোমাকে মর‌তে দি‌লে তো! জীব‌নে না পে‌লে‌ও আজও তােমা‌কে ভা‌লোবা‌সি।
আ‌মিও! আ‌মি আমার ভুল বুঝ‌তে পে‌রে‌ছি।
 আ‌মি জানতাম তুমি ফি‌রে আস‌বে।
নীত‌ু ছলছল চো‌খে অন‌িকের দিকে তা‌কি‌য়ে থাকে। তারপর অ‌নিক‌কে শক্ত করে জড়িয়ে ধ‌রে কাঁদ‌তে থা‌কে।
অনিক সান্ত্বনা দি‌য়ে ব‌লে, বহু‌দিন পর তুমি আমার হৃদ‌য়ে ফি‌রে এসেছ। এমন স‌ু‌খের দি‌নে কাঁদ‌তে নেই।
নীতুর কান্না আরও বে‌ড়ে যায়! এ যে বড় সু‌খের কান্না!
 লেখক: প্রদীপ হালদার
‌রেখাখালী, ইন্দুরকানী, পি‌রোজপুর
‌মোবাইল নাম্বার: ০১৭৫৪৬২১৭৬৩

Top