ঢাকা, ||

নির্বাচনী ইশতেহারে ধর্মীয় প্রসংগ


মতামত

প্রকাশিত: ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৪, ২০১৮

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের উন্নয়নকে তুলে ধরা হচ্ছে। উন্নয়ন প্রচারের জন্য ব্যাপকভাবে হয়ে গেল চতুর্থ জাতীয় উন্নয়ন মেলা। রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ, রেলপথসহ ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু শুধু রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন হলেই কি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন হয়? রাস্তা-ঘাট ইত্যাদির উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের মানুষের মূল্যবোধের উন্নয়ন হলেই তা সত্যিকারের উন্নয়ন। মূল্যবোধের উন্নয়ন না হলে সরকার রাস্তা তৈরি করবে আর জনগণ সে রাস্তায় ব্যবহৃত ইট, রড রাস্তা থেকে তুলে বাড়িতে নিয়ে যাবে।

বাহ্যিকভাবে একটি রাষ্ট্রের কোনো হাত-পা থাকে না। বরং রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় উপাদান জনগণের হাত-পা-ই রাষ্ট্রের হাত-পা। জনগণ ভালো হলেই রাষ্ট্র ভালো। জনগণ যদি হয় সোনার মানুষ তাহলে দেশটি হয় সোনার দেশ। তার মানে সোনার বাংলাদেশ গড়তে হলে মূল্যবোধসম্পন্ন সোনার নাগরিক গড়তে হবে। দুঃখজনক হলো, দুর্নীতি প্রতিরোধে ‘ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা উভয়েই জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে’ -এ ধরণের ধর্মীয় বাণীকে সামনে আনলেও বড় দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতিহারে ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরির প্রয়োজনীয় বিষয় থাকে না। অথচ এদেশের সাধারণ নাগরিকদের ভোটে ধর্মীয় চেতনার প্রভাব অনস্বীকার্য।

দেশের বড় একটা সমস্যা হলো মাদক। দেশের রাস্তাঘাট উন্নত হলেও প্রজন্ম যদি মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে তাহলে সে উন্নয়ন থলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হবে। ক্রমবর্ধমান অপরাধের অনেকগুলোর মূলেই মাদক। মাদকের অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে মাদকসেবীরা। চুরি, ছিনতাই, যৌন অপরাধ, অস্ত্র ব্যবসাসহ নানা অপরাধে লিপ্ত হয় তারা। বিশেষ করে মাদকাসক্ত কিশোররা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধী। এরা এতই বেপরোয়া যে, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের ওপর হামলে পড়ছে। স্কুল-কলেজের মেয়েদের ইভটিজিং করছে। মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে খুন হতে হচ্ছে বাবা-মা ভাই বোন কিংবা সহপাঠীকে।

ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনার পেছনেও মাদক ব্যাপকভাবে দায়ী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে ২১ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায় (যদিও সংবাদপত্রে প্রকাশিত দুর্ঘটনার খবরের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী এ সংখ্যা প্রায় অর্ধেক)। (জনগণ্ঠ : ২৩ অক্টোবর, ২০১৬)। এই বিরাট সংখ্যক সড়ক দুর্ঘটনার ৩০ শতাংশই ঘটছে চালকদের মাদকাসক্তির কারণে। (বণিক বার্তা : ৩০ জুন, ২০১৮)। তার মানে শুধু সড়কেই ৬ হাজার ৩০০ মানুষকে ড্রাইভারদের মাদক সেবনের কারণে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হচ্ছে। প্রাণহানিসহ বিভিন্ন ভয়ঙ্কর অপরাধের মূলে থাকা এই মাদক সেবনের তালিম কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েই নেয় অনেক শিক্ষার্থী। দৈনিক কালের কণ্ঠের ৪ নভেম্বর, ২০১৭ সম্পাদকীয় ছিল ‘ঢাবি-বুয়েট মাদকের আখড়া’। দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে ১৬ মার্চ ২০১৭ এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের মোট ইয়াবা আসক্তদের ৪০ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে ৪ জুলাই, ২০১৮ এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘চবি এখন মাদকের আখড়া’। দেশের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার শীর্ষ বিদ্যাপীঠগুলোর যেখানে এ অবস্থা সেখানে দেশের শীর্ষ ইসলামী বিদ্যাপীঠগুলোতে মাদকাসক্তি শূন্যের কোটায়। হাটহাজারি, লালবাগ কিংবা জামিয়া ইমদাদিয়ার কোনো ছাত্র কখনো মাদকাসক্ত ছাত্র পাওয়া যাবে না। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত হাজার হাজার মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রেও মাদরাসা ছাত্রদের উপস্থিতি হবে প্রায় শূন্যের কোটায়। দেশের মোট মাদকসেবীর ১৭ শতাংশ নারী। (ইনকিলাব, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭)। এ ১৭ শতাংশের ১ শতাংশও কিন্তু মহিলা মাদরাসার ছাত্রী নেই। তার মানে যেখানে ইসলামী শিক্ষা, সেখানে নেই মাদক। আর যে প্রজন্ম মাদকমুক্ত সে প্রজন্মই অনেক অপরাধ থেকে মুক্ত।

যেহেতু ভয়ঙ্কর অপরাধগুলো মূলে মাদকাসক্তি তাই অপরাধমুক্ত সমাজ গড়তে হলে, আলোকিত বা সোনার বাংলাদেশ গড়তে হলে মাদকমুক্ত বাংলাদেশ অপরিহার্য। আর মাদকমুক্ত প্রজন্ম চাইলে সে প্রজন্মকে যে কোরআনের শিক্ষা হাটহাজারি জামিয়ার মতো ক্যাম্পাসগুলোতে দেওয়া হয় সে শিক্ষার মৌলিক অংশটুকু দিয়ে তাদেরকে আলোকিত করে দিতে হবে। দুঃখজনক হলো, ৯০ ভাগ মুসলমানের এ দেশে বড় দলগুলোর নির্বাচনী ইশতিহারে ধর্মীয় শিক্ষা চরমভাবে উপেক্ষিত হয়।

ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার এ বাস্তবতা অনুধাবন করেই হয়তো বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ জন করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা করেছিলেন। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘সরকার সারা দেশে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।’ (প্রথম আলো : ২১- জানুয়ারি, ২০১০)।

ঘোষণার ৮ বছর পেরিয়ে গেছে। প্রতিটি প্রাইমারি স্কুলে ক্রীড়া ও সঙ্গীত বিষয়ক শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি আজও। ধর্মের সঙ্গে এদেশের মানুষের সম্পর্কের বাস্তবতাকে কোনো অদৃশ্য কারণে যেন অনেক রাজনৈতিক নেতারা এড়িয়ে যেতে চান! মাদক, দুর্নীতি ও অপরাধমুক্ত সমাজ গড়তে ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরির লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত ১০০ নম্বরের ইসলামিক স্টাডিজ বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি থাকুক বড় দলগুলোর নির্বাচনী ইশতিহারে এটা এদেশের গণমানুষের প্রত্যাশা।

ধর্মীয় কিছু বিষয় আছে যেগুলোর ব্যাপারে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বারোপ করলে একদিকে যেমন জনগণ খুশি হবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রেরও ব্যাপক লাভ হবে। এমনই একটি বিষয় হলো জাকাতের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচনের কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ। দারিদ্র বিমোচনে জাকাতের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগালে মাত্র কয়েক বছরেই দারিদ্র পালাবে বাংলাদেশ থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অর্লিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবির হাসান বাংলাদেশের সম্পদ নিয়ে গবেষণা করে বলেন, যথাযথভাবে জাকাত আদায় করা হলে বাংলাদেশে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকার জাকাত আদায় করা সম্ভব। (প্রথম আলো : ১৬ মে, ২০১৭)।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে বর্তমান বাংলাদেশে ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৬১ জন কোটিপতি আছেন। (মানবজমিন : ২৫-১১-২০১৬)। এদের সম্পদ থেকে ২.৫ % করে জাকাত আদায় করলে আসলেই ৬০ হাজার কোটি টাকা আদায় সম্ভব। এই আদায়যোগ্য জাকাতের বিপুল অর্থের বিপরীতে গরিব মানুষের সংখ্যা কত? জাতীয় সংসদে ৩ বছর আগে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ভূমিহীন পরিবারের সংখ্যা ১৫ লাখ ৮ হাজার ৮৭৬। (ইত্তেফাক: ১৭-১১-২০১৪) ১৬ লাখ (প্রায়) পরিবারের দারিদ্র্যের বিপরীতে আদায়যোগ্য জাকাতের পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এ বছর ৬০ হাজার কোটির স্থলে যদি ৫০ হাজার কোটি টাকাও আদায় করা গেলে ২৫ লাখ পরিবারকে দেওয়া যেত ২ লাখ টাকা করে। এবার যে ২৫ লাখ পরিবারকে ২ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে তাদেরকে কি আগামী বছর জাকাত দেয়ার প্রয়োজন হবে? না। আগামী বছর অন্য ২৫ লাখ পরিবারকে দেয়া যাবে ২ লাখ টাকা করে। ২-৩ বছর পর নতুন জাকাত দাতার পরিমাণও বাড়বে। প্রথম বছর যে ২৫ লাখ পরিবারকে দেয়া হলো তৃতীয় বছরে এসে তাদের সিংহভাগই অল্প হলেও জাকাত দিতে পারবে। তাদের জাকাতও যোগ হবে জাকাত তহবিলে। গ্রহীতা কমবে, বাড়বে দাতা। অন্যদিকে বাংলাদেশে আদায়যোগ্য ৫০ হাজার কোটি টাকা প্রথম বছর যদি ২৫ লাখ পরিবারকে না দিয়ে ওই ভূমিহীন ১৫ লাখ পরিবারের মধ্যে বণ্টন করা হয় তবুও তো প্রতি পরিবারকে দেয়া যাবে তিন লাখ টাকারও বেশি করে। এক বছরে ভূমিহীন পরিবার শেষ। পরের বছর যদি ভিক্ষুক টার্গেট করে তাদের পুনর্বাসন করা হয় তাহলে সে বছরে ভিক্ষুকদের দারিদ্র শেষ। এভাবে মাত্র ৫ বছরেই বাংলাদেশ দারিদ্রসীমার উপরে চলে যেতে পারবে। ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে লন্ডন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েলথ এক্স’ জরিপ করে বলেছে, পৃথিবীতে অতি ধনী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুতহারে বাড়ছে বাংলাদেশে। অন্যদিকে ২১ জানুয়ারি, ২০১৮ দৈনিক আমাদের সময়ে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে আর গরিবরা আরো গরিব হচ্ছে। তার মানে বাড়ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। এ বৈষম্য কমাতে জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
জাকাত আদায় করা হলে ধনীদেরও কোনো সমস্যা হবে না। কারণ জাকাত আদায় করা হয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থেকে মাত্র ২.৫%। দুঃখজনক হলো, জাকাতে এত বিশাল সম্ভাবনা থাকার পরও কোনো নির্বাচনেই বড় দলগুলো তাদের ইশতিহারে জাকাতভিত্তিক অর্থনীতির কথা বলে না। রাস্তা-ঘাটের উন্নয়নের পাশাপাশি মূল্যবোধসম্পন্ন উন্নত নাগরিক তৈরিতে ধর্মীয় শিক্ষা, আর দারিদ্র বিমোচনে জাকাতের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার কথা যে দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আনবে, আশা করা যায় এদেশের সিংহভাগ জনগণই তাদের পক্ষে থাকবে।

লেখক :

মাওলানা যুবায়ের আহমাদ

কলামিস্ট ও গবেষক

Top