ঢাকা, ||

হিজরতের আগে মক্কায় মহানবীর (সা.) নেতৃত্ব


ইসলাম

প্রকাশিত: ৭:২১ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৬, ২০১৮

বহু প্রমাণাদির আলোকে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, বিশ্বনবী (সা.) এর যুগে মক্কায় প্রচলিত অর্থে নিয়মতান্ত্রিক কোনো রাজত্বের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল না। এ জন্যই কুরাইশী গোত্রসমূহের ভূমিকা সীমাবদ্ধ ছিল। এর বিপরীতে মহানবী (সা.) তার মক্কী জীবনেই একজন দূরদর্শী এবং আদর্শ নেতার ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। এর কয়েকটি দৃষ্টান্ত আমরা তুলে ধরছি—

১. হিলফুল ফুযুল প্রতিষ্ঠা

মহানবী (সা.) এমন একটি সময় আরব ভূমিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যখন আরব সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা বিরাজ করছিল। এ সমাজে ছিল না কোনো নিয়মনীতি ও আইনের শাসন। গোত্রীয় কলহ, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, সামাজিক শ্রেণিভেদ, নারী নির্যাতন, ব্যাভিচার, সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া প্রভৃতি সমাজকে মারাত্মকভাবে কলুষিত করেছিল। ঐতিহাসিকরা আরবের এই সময়কে ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’ বা ‘অন্ধকার যুগ’ বলে অভিহিত করেছেন।

অন্ধকার যুগের এই রক্তপাত, অন্যায় ও অনাচার বালক মুহাম্মদ (সা.)- এর মনে গভীর রেখাপাত করে। তিনি সমাজের সব অন্যায়, অবিচার ও নির্যাতন বন্ধের উপায় খুঁজে বের করার জন্য সর্বদা চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। অবশেষে তাঁর মনে একটি অভিনব চিন্তার উদয় হলো। তিনি তাঁর সমবয়সী কতিপয় যুবককে নিয়ে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে একটি শান্তি সংঘ গড়ে তুললেন। এ সংগঠন সমাজের সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল।

২. হজরে আসওয়াদ স্থাপন

হজরে আসওয়াদ স্থাপনকে কেন্দ্র করে আরবের গোত্রসমূহের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা পরিলক্ষিত হয়েছিল। এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মৌলিকভাবেই আরবে কোনো রাজনৈতিক শৃঙ্খলা বিদ্যমান ছিল না। প্রতিটি ব্যক্তি এবং প্রত্যেকটি গোত্র নিজ নিজ ডঙ্কা বাজাত এবং নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে প্রকাশ করতে চাইত। কিন্তু, মহানবী (সা.) এর বিদ্যমানতায় তাদের নিম্নতর মনে হচ্ছিল। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের শিরস্ত্রাণ কেবল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর শিরেই মানানসই বলে দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। তাই আল্লাহ তাআলা হজরে আসওয়াদ স্থাপনের সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর বড়ত্ব ও মনোনীত হবার বিষয়টি সাব্যস্ত করে দেন। এ সময় গোত্রসমূহের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ মহানবী (সা.)- এর ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বকে নেতা হিসাবে মেনে নিতে হৃষ্টচিত্তে সম্মত হয়ে যায়। আর এভাবেই মহানবী (সা.) সকল সর্দারের উপস্থিতিতে হজরে আসওয়াদ স্থাপন করে অভ্যন্তরীণ অর্থে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

৩. হরবে ফুজ্জারে অংশগ্রহণ

মাত্র ১৪ বছর বয়সে মহানবী (সা.) হরবে ফুজ্জারে অংশগ্রহণ করেন। তিনি নিজের গোত্রের পক্ষে সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর যুদ্ধের এই স্তরটিই পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বের ভিত্তি হয়ে যায়।

৪. হাবশায় হিজরতের নির্দেশ

এটাও মহানবী (সা.) এর নেতৃত্ব এবং কর্তৃত্বই ছিল যার অনুমতি পেয়ে মক্কার নিপীড়িত, নির্যাতিত মুসলমানরা হাবশায় হিজরত করেন। এ সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশীর কাছে যে পত্র লেখেন, তার প্রতিটি অক্ষরই এ বিষয়ের সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, এই পত্রের প্রেরক বহু গুণের আকর এক সুমহান সত্তা!

৫. মদিনায় হিজরত

ইসলামের আহবায়ক ও দায়ী হিসেবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বহু ধৈর্যের ঘাঁটি অতিক্রম করতে হয়েছিল এবং মক্কার মুশরিকরা সব সময় সত্যের আওয়াযের বিরোধিতা করে গিয়েছিল। কিন্তু, আল্লাহ তাআলা তার সাহায্য ও সহযোগিতার জন্য আহলে ইয়াছরিব তথা মদীনাবাসীদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। এটাই ছিল ওই স্তর যার মাধ্যমে একদিকে এই সত্য স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ইসলাম কোনো স্থান ও কালের ধর্ম নয় বরং তা সর্বকালীন ও সার্বজনীন ধর্ম। আর এই পবিত্র দ্বীন ও ধর্মের প্রতি আহবানকারী ব্যক্তিও চিরন্তন শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্বের বিশেষণে বিশেষিত। এ জন্যই মক্কাবাসীদের ঔদ্ধত্য ও অহংকারের বিপরীতে মদীনাবাসীরা চিরন্তন এই ধর্মকে সাগ্রহচিত্তে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন এবং এই দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সাহায্য ও সহযোগিতাকারী হয়ে গিয়েছিলেন। তৎকালীন যুগে মদীনার অধিবাসীরা বিভিন্ন ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাসে নিরত ছিল। এখানে আরবের পৌত্তলিকরা থাকত। থাকত ইহুদীরাও। আর অল্প সংখ্যক খ্রিস্টানও সেখানে বিদ্যমান ছিল। মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুশরিকদের দুটি বড় গোত্র আওস ও খাযরাজের যুবকদের বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সাহায্যকারী আনসার বানিয়ে দিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে যখন আকাবার বাইআত সংঘটিত হয়েছিল তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মদীনার পরিবেশে মৌলিক পরিবর্তনের ভিত্তি সূচিত হয়ে গিয়েছিল। এভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর নেতৃত্বের আলো অধিক পরিমাণে উজ্জ্বল হয়ে দীপ্তি বিকিরণ করছিল।

এসব অবস্থা এবং প্রতিভার স্ফূরণ ও বিচক্ষণতা এ বিষয়ের স্পষ্ট প্রমাণ যে, যখন আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন তখন কেয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য তার পবিত্র সত্তাকে হেদায়েত ও সৌভাগ্যের আদর্শ বানিয়েছেন। আর কেয়ামত পর্যন্ত সময়ে মানুষ ও মানবতার জন্য প্রতিটি যুগ ও সভ্যতার কল্যাণে সর্বপ্রকার দিক নির্দেশনার জন্য তাকেই আলোর মিনার সাব্যস্ত করা হয়েছে। মহানবী (সা.) এর এই মর্যাদা এবং শ্রেষ্ঠত্বই সামনে অগ্রসর হয়ে মদীনা শরীফে সর্বপ্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হয়ে গিয়েছিল।

Top