ঢাকা, ||

যেভাবে অসুস্থ ব্যক্তি নামায আদায় করবেন


ইসলাম

প্রকাশিত: ৬:১৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০১৮

ঈমানের পর পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই কেউ অসুস্থ হলেও যতক্ষণ তার জ্ঞান আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার নামায আদায় করতে হবে। ওযু-গোসল না করতে পারলে তায়াম্মুম করে, তাও না পারলে বিনা তায়াম্মুমেই নামায আদায় জরুরি।

রোগী দাঁড়িয়ে নামায পড়তে সক্ষম না হলে বসে নামায পড়বেন। দুই পা গুটিয়ে আড়াআড়িভাবে রেখে হাঁটু ভাঁজ করে (বাবু হয়ে) বসবে। কখনো কখনো প্রয়োজনে মহানবী (সা.) অনুরুপ বসে নামায পড়তেন। (নাসাঈ, মুস্তাদরাকে হাকেম) আব্দুল্লাহ বিন উমার (রা.) অসুবিধার কারণে নামাযে অনুরুপ বসতেন। (বুখারী ৮২৭নং)

অবশ্য তাশাহহুদের বৈঠকে বসার মতোও বসে নামায পড়তে পারে। (ফিকহুস সুন্নাহ আরবী ১/২৪৩)

বসে না পারলে (ডান) পার্শ্বদেশে শুয়ে, তা না পারলে চিৎ হয়ে শুয়ে, (মাথাটা বালিশ ইত্যাদি দিয়ে একটু উঁচু করে) কেবলার দিকে মুখ ও পা করে নামায পড়বে। দাঁড়াতে সক্ষম হলে এবং বসতে না পারলে দাঁড়িয়ে নামায পড়বেন।

মহান আল্লাহ বলেন,

فَاذْكُرُوا اللهَ قِيَاماً وَّقُعُوْداً وَّعَلَى جُنُوْبِكُمْ

অর্থাৎ, তোমরা দাঁড়িয়ে, বসে ও পার্শ্বদেশে শয়ন করে আল্লাহকে স্মরণ কর। (কুরআন মাজীদ ৪/১০৩)

আল্লাহ এরশাদ করেন,  (فَاتَّقُوا اللهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ)

অর্থাৎ, আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় করে চল। (কুরআন মাজীদ ৬৪/১৬)

ইমরান বিন হুসাইন (রা.) বলেন, আমার অর্শ রোগ ছিল। আমি (কিভাবে নামায পড়ব তা) আল্লাহর রসূল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ‘তুমি দাঁড়িয়ে নামায পড়। না পারলে বসে পড়। তাও না পারলে পার্শ্বদেশে শুয়ে পড়।’ (বুখারী, আবূদাঊদ, মুসনাদে আহমাদ, মিশকাত-১২৪৮)

কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও যদি অসুস্থ ব্যক্তি বসে নামায না পড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন, তাহলে তার জন্য রয়েছে দিগুণ সওয়াব। একদা একদল লোকের নিকট মহানবী (সা.) বের হয়ে দেখলেন, তারা অসুস্থতার কারণে বসে বসে নামায পড়ছে। তা দেখে তিনি বললেন, ‘বসে নামায পড়ার সওয়াব দাঁড়িয়ে নামায পড়ার সওয়াবের অর্ধেক।’ (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ)

অনুরুপ বসে নামায পড়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি আরাম নেয়ার জন্য রোগী শুয়ে নামায পড়ে তাহলে তার জন্য রয়েছে অর্ধেক সওয়াব। (বুখারী-১১১৫)

যতটা সম্ভব দাঁড়িয়ে এবং যতটা প্রয়োজন বসেও নামায পড়তে পারেন। বৃদ্ধ বয়সে মহানবী (সা.) রাতের নামাযে বসে ক্বিরাআত পাঠ করতেন। অতঃপর ৩০/৪০ আয়াত ক্বিরাআত বাকি থাকলে তিনি উঠে তা পাঠ করে রুকু করতেন। (বুখারী-১১১৮)

অসুস্থ ব্যক্তি সাধ্যমতো রুকু-সিজদাহ করবেন। না পারলে মস্তক দ্বারা ইঙ্গিত করবেন। রুকুর চাইতে সিজদার সময় অধিক ঝুঁকবেন। তা সম্ভব না হলে চোখের ইশারায় রুকু-সিজদাহ করবেন। রুকুর চাইতে সিজদার ক্ষেত্রে চক্ষুকে অধিকতর নিমীলিত করবেন।

হাত বা আঙুল দ্বারা ইশারা বিধিসম্মত নয়। কারণ, অনুরুপ নির্দেশ শরীয়তে আসেনি। (ইবনে বায, ইবনে উসাইমীন)

চক্ষু দিয়ে ইশারা সম্ভব না হলে অন্তরে (কল্পনায়) কিয়াম, রুকু ও সিজদা আদায়ের নিয়ত করে তাকবির, ক্বিরাআত ও দুআ-দরুদ পাঠ করবেন।

আত্মাকে কষ্ট দিয়ে সাধ্যের অতীত আমল করা শরীয়তে পছন্দনীয় নয়। সিজদাহ মাটিতে না করতে পারলে কোনো জিনিস উঁচু করে বা তুলে তাতে সিজদাহ করা বৈধ নয়। একদা মহানবী (সা.) এক রোগীকে দেখতে গিয়ে দেখতে পেলেন, সে বালিশের উপর সিজদাহ করছেন। তিনি তা নিয়ে ফেলে দিলেন। সে একটি কাঠ নিলে কাঠটাকেও ফেলে দিলেন। অতঃপর বললেন, ‘যদি সক্ষম হও তাহলে মাটিতে নামায পড় (সিজদাহ কর)। তা না পারলে কেবল ইশারা কর। আর তোমার রুকুর তুলনায় সিজদাকে অধিক নিচু কর।’ (ত্বাবারানী, বাযযার, বায়হাকী, সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ, আলবানী ৩২৩)

অবশ্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পড়ে যাওয়ার ভয় হলে দেয়াল বা খুঁটিতে ভর করে দাঁড়াতে পারেন। মহানবী (সা.) যখন বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন এবং স্বাস্থ্য ভারী হয়ে গেল, তখন তাঁর নামাযের জায়গায় একটি খুঁটি বানানো হয়েছিল, যাতে তিনি ভর করে নামায পড়তেন। (আবু দাঊদ, মুতাদরাকে হাকেম, সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহীহাহ, আলবানী ৩১৯, ইর: ৩৮৩)

অসুস্থ অবস্থায় পূর্ণরুপে নামায আদায় করতে সক্ষম না হলেও সুস্থ অবস্থার মতো পূর্ণ সওয়াব লাভ হয়ে থাকে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘বান্দা যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে অথবা সফর করে, তখন আল্লাহ তাআলা তার জন্য সেই সওয়াবই লিখে থাকেন, যে সওয়াব সে সুস্থ ও ঘরে থাকা অবস্থায় আমল করে লাভ করত।’ (মুসনাদে আহমাদ, বুখারি, জামে ৭৯৯)

অসুস্থতার সময়টা বেকার শুয়ে-বসে কাটাই আমরা। অথচ এ সময়টাকে মূল্যায়ন করে আল্লাহর যিকর করতে পারি। কষ্টের সময়ে কেবল তাঁরই সকাশে আকুল আবেদনের সাথে নফল নামায ও খাস মুনাজাত করার এটি একটি সুবর্ণ সময়। বহু অসুস্থ ব্যক্তির রাতে ঘুম হয় না। এমন অনিদ্রায় অযথা রাত্রি অতিবাহিত না করে তাহাজ্জুদ পড়ে আমরা পরপারের জন্য সম্বল বৃদ্ধি করতে পারি। পরীক্ষিত যে এতে করে হৃদয়ে প্রশান্তি আসে, তখন ঘুমও চলে আসে।

মানসিক শক্তি সুস্থতার জন্য বড় সহায়ক। এটা ইবাদতের মাধ্যমে অর্জিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ ۗ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তর সমূহ শান্তি পায়। – সুরা রা’দ: ২৮

Top